২০ অক্টোবর ২০২৬ , ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ


পরীক্ষামূলক সম্প্রচার

ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

জামিয়া কাশিফুল উলূম ঢাকা

দরসে নেজামীর সঙ্গে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির পাঠ, রাজধানীতে কওমি মাদ্রাসায় সমন্বিত উদ্যোগ

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | ন্যশনাল টাইমস টোয়েন্টিফোর.কম
আপলোড সময় : ১০-১০-২০২৬ ১২:৪৮:০০ অপরাহ্ন
দরসে নেজামীর সঙ্গে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির পাঠ, রাজধানীতে কওমি মাদ্রাসায় সমন্বিত উদ্যোগ

কওমি মাদ্রাসার প্রচলিত শিক্ষাধারায় কোরআন-হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা ও ইসলামী জ্ঞানচর্চাই মূল বিষয়। এর পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে কওমি শিক্ষায় স্বতন্ত্রভাবে সাধারণ ও ব্যবহারিক জ্ঞান যুক্ত করার কিছু উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সাধারণ শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণকে একই শিক্ষাব্যবস্থার আওতায় আনার এমনই একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে রাজধানীতে।

রাজধানীর জামেয়া কাশিফুল উলূমে কওমি শিক্ষার দরসে নেজামীর পাশাপাশি স্কুল ও কলেজের পাঠ্যক্রম চালু রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা দরসে নেজামীর পাঠের সঙ্গে স্কুলের বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। পাশাপাশি কম্পিউটার, ভাষা ও বিভিন্ন কারিগরি বিষয়ে প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রমে কওমি ও সাধারণ শিক্ষাকে পাশাপাশি রাখার একটি কাঠামো অনুসরণ করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দিনের বেলায় মাদ্রাসার নিয়মিত কার্যক্রম এবং রাতে স্কুল ও কলেজ বিভাগের পাঠদান চলে। ফলে একই শিক্ষার্থী ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার পাঠক্রমও অনুসরণ করছে।

 
জামেয়া কর্তৃপক্ষ জানায়, স্কুল বিভাগের বিজ্ঞান শাখা থেকে শিক্ষার্থীরা এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটির এসএসসি পরীক্ষার্থীরা শতভাগ পাস করেছেন বলে জানিয়েছেন তারা। কওমি শিক্ষার সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার এই সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামনে উচ্চশিক্ষার আরও সুযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানান।
 

দরসে নেজামীর সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

কওমি শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারিক জ্ঞান দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। মাদ্রাসাটি পরিদর্শন করে দেখা গেছে, এখানে সায়েন্স ল্যাব ও কম্পিউটার ল্যাব রয়েছে। শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার গ্রাফিক্স ডিজাইন, আউটসোর্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং ও ভিডিও এডিটিংয়ের মতো বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

 

এ ছাড়া লাইটিং ও ক্যামেরা পরিচালনা এবং ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিকসের ব্যবহারিক শিক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। প্রযুক্তি ও কারিগরি প্রশিক্ষণের এসব বিষয়কে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ দক্ষতা তৈরির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

আরবি ও ইংরেজি ভাষার চর্চা

ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ আরবি ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষা শিক্ষাতেও আলাদা কার্যক্রম রয়েছে। মাদানী নেসাবের আলোকে শিক্ষার্থীদের আরবি বলা, পড়া ও লেখার অনুশীলন করানো হয়। আরবি কথোপকথনের চর্চাও রয়েছে।

ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা বাড়াতে চালু করা হয়েছে ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ ক্লাব। ভাষা শিক্ষার এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় পাঠের পাশাপাশি যোগাযোগ দক্ষতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

পাঠ্যবইয়ের বাইরে নানা কার্যক্রম

শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রমের বাইরে সৃজনশীল ও সহশিক্ষা কার্যক্রমও রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে বাংলা ও আরবি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করা হয়। রয়েছে আর্টস ও ক্যালিগ্রাফি বিভাগ। শারীরিক প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে মার্শাল আর্টসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

সামাজিক কার্যক্রমেও শিক্ষার্থীদের যুক্ত করা হচ্ছে। সপ্তাহে একদিন পথশিশুদের জন্য খাবার রান্না করা হয় বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ‘পথশিশুদের মক্তব’ কর্মসূচির মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের খাবার দেওয়ার পাশাপাশি ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হয়। জাতীয় দিবসগুলোতে বিভিন্ন কর্মসূচি এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমেও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ রয়েছে।

এর পাশাপাশি সুন্নাহ পরিপালন, আমল-আখলাক ও দাওয়াহভিত্তিক কার্যক্রমকে শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

যে ভাবনা থেকে এই উদ্যোগ

জামেয়া কাশিফুল উলূমের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে কওমি মাদ্রাসার সিলেবাস ও কারিকুলাম নিয়ে কাজ করছেন বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই জামিয়ায় ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে সাধারণ শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি প্রশিক্ষণ যুক্ত করা হয়েছে।

সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ কালবেলাকে বলেন, ‘একটি মুসলিম দেশের নতুন প্রজন্মকে কোরআন ও হাদীসের শিক্ষার পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও আধুনিক মননচর্চায় দক্ষ করে গড়ে তোলা সময়ের দাবি। আমরা এমন শিক্ষার্থী তৈরি করতে চাই, যারা দ্বীনের জ্ঞান ধারণের পাশাপাশি আধুনিক বিশ্ব সম্পর্কে জানবে এবং দেশ ও সমাজের জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।’

তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের শুধু সনদনির্ভর শিক্ষায় সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না। তারা যেন জ্ঞান, চরিত্র ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ হয় এবং ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, আমাদের শিক্ষা পরিকল্পনায় বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’

সামনে যে প্রশ্নগুলো

কওমি মাদ্রাসার প্রচলিত শিক্ষার সঙ্গে সাধারণ শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি প্রশিক্ষণকে একই শিক্ষাব্যবস্থায় রাখা সহজ নয়। দুটি ধারার পাঠক্রমের ভারসাম্য, শিক্ষকদের দক্ষতা, ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ এবং শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ তৈরি হচ্ছে কি না, এসব বিষয়ও এ ধরনের উদ্যোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা এসএসসি পরীক্ষার পর উচ্চশিক্ষায় কোন কোন সুযোগ পাচ্ছে, কারিগরি প্রশিক্ষণ তাদের কর্মজীবনে কতটা কাজে লাগছে এবং ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বিত পাঠক্রম দীর্ঘমেয়াদে কী ফল দিচ্ছে, সেটিও এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা বোঝার ক্ষেত্রে বিবেচ্য।

কওমি শিক্ষার মূল ধারাকে বজায় রেখে সাধারণ শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞানকে একই শিক্ষাজীবনের সঙ্গে যুক্ত করার যে উদ্যোগ জামেয়া কাশিফুল উলূমে নেওয়া হয়েছে, তা কওমি শিক্ষার পরিবর্তিত চাহিদা নিয়ে চলমান আলোচনার একটি উদাহরণ। এর ভবিষ্যৎ প্রভাব নির্ভর করবে শিক্ষার্থীদের পরবর্তী শিক্ষাজীবন, দক্ষতা অর্জন এবং বাস্তব কর্মক্ষেত্রে এসব শিক্ষার প্রয়োগের ওপর।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ